সর্বশেষ

নীল খামের শেষ চিঠি

চা চুমুকে গল্প

নীল খামের শেষ চিঠি

✍ freesinebd 📅 Monday, February 16, 2026 👁 0 বার দেখা হয়েছে
নীল খামের শেষ চিঠি

 


পৌষের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। কমলাপুর স্টেশনের চারপাশটা তখন ধোঁয়াটে চাদরে ঢাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আরিয়ান নীলফামারী এক্সপ্রেসের জন্য ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছিল। কনকনে ঠান্ডায় হাতের চায়ের কাপ থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে। ঠিক তখনই ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল। হন্তদন্ত হয়ে ভিড় ঠেলে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল এক তরুণী। পরনে তার হালকা নীল রঙের সুতি সালোয়ার কামিজ, কাঁধে একটা কাপড়ের ঝোলা ব্যাগ, আর হাতে রবিঠাকুরের একটা গল্পের বই। কুয়াশার মাঝেও মেয়েটার চোখেমুখে এক অদ্ভুত চপলতা ছিল।

ট্রেন ছাড়ার পর আরিয়ান দেখল, তার ঠিক মুখোমুখি সিটেই মেয়েটির জায়গা হয়েছে। জানালার বাইরের ধাবমান গ্রামবাংলার দৃশ্য দেখতে দেখতে তনিমা

হ্যাঁ, পরে জানা গিয়েছিল ওটাই তার নামগুনগুন করে গান গাইছিল। আরিয়ানের বইয়ের প্রতি ঝোঁক দেখে তনিমা নিজেই কথা শুরু করল। সেই ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ ট্রেন যাত্রায় ট্রেনের চাকার ছন্দ আর বাইরের প্রকৃতির বদলে যাওয়া দৃশ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ল তাদের আলাপ। তনিমা চারুকলা অনুষদের ছাত্রী, আর আরিয়ান ইংরেজি সাহিত্যের। ঢাকা-নীলফামারী রোডের শত শত কিলোমিটার পথ যেন নিমিষেই ছোট হয়ে এল। স্টেশনে পৌঁছানোর আগে যখন তনিমা নিজের ফোন নম্বরটা আরিয়ানের ডায়েরির পাতায় লিখে দিচ্ছিল, তখন ট্রেনের মৃদু আলোয় দুজনের চোখেই এক নতুন স্বপ্নের ঝিলিক খেলে গেল।

ঢাকায় ফেরার পর সেই ট্রেনের বন্ধুত্ব দ্রুত প্রেমে রূপ নিল। কার্জন হলের লাল ইটের দেয়ালগুলো যেন তাদের হাজারো গোপন কথার সাক্ষী হয়ে রইল। টিএসসির আড্ডায় ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে কিংবা মল চত্বরের ঘাসের ওপর কাটানো বিকেলগুলো শুধু তাদের জন্যই তৈরি হয়েছিল। তনিমা ছিল একটু চঞ্চল, আর আরিয়ান ছিল শান্ত ও মিতভাষীঠিক যেন এক জোড়া বিপরীত মেরু, যারা একে অপরকে পূর্ণ করত।

তনিমা যখন চারুকলার বারান্দায় বসে ক্যানভাসে তুলির আঁচড় কাটত, আরিয়ান অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত ওর একাগ্রতার দিকে। মাঝেমধ্যে তনিমা রেগে গিয়ে বলত, "কী দেখছ অমন করে?" আরিয়ান হাসিমুখে উত্তর দিত, "চিত্রকরের চেয়েও সুন্দর কোনো ছবি আঁকা যায় কি না, তা-ই দেখছি।" ভালোবাসা দিবসে একগুচ্ছ অপরাজিতা ফুল দিয়ে আরিয়ান যখন তনিমাকে প্রথম 'ভালোবাসি' বলেছিল, তখন রোকেয়া হলের গেটে হাজারো মানুষের কোলাহলের মাঝেও এক গভীর নীরবতা নেমে এসেছিল। তনিমার চোখের জলটুকু তখন শুধু আরিয়ানই পড়তে পেরেছিল। তাদের সেই মিষ্টি খুনসুটি আর গভীর অনুরাগের গল্প পুরো ক্যাম্পাসে রোমান্টিকতার এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই স্বপ্নিল চার বছর কীভাবে চোখের পলকে কেটে গেল, তারা টেরই পায়নি। কিন্তু ক্যাম্পাস জীবনের সীমানা পেরোতেই শুরু হলো জীবনের কঠোর রূঢ় বাস্তবতা। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে আরিয়ানের ওপর তখন ভবিষ্যতের বিশাল দায়ভার। সে হন্যে হয়ে একটা ছোট চাকরিতে যোগ দিল, যা দিয়ে নিজের জীবন চালানোই দায়, সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সংসার শুরুর চিন্তা ছিল আকাশকুসুম কল্পনা।

 

অন্যদিকে, তনিমার অভিজাত পরিবারে তখন যুদ্ধের দামামা। তার বাবা সাফ জানিয়ে দিলেন, একজন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছেলের হাতে তিনি তার আদরের মেয়েকে তুলে দেবেন না। তনিমার ওপর একের পর এক বিয়ের চাপ আসতে শুরু করল। বিচ্ছেদের চূড়ান্ত সুরটা বাজল এক বিষণ্ণ শ্রাবণের সন্ধ্যায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোণে, যেখানে তারা কত শত বিকেল কাটিয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে তনিমা ডুকরে কেঁদে উঠল। ভেজা কণ্ঠে জানালো, তার বাবা তাকে উচ্চশিক্ষার অছিলায় দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঘর বাঁধার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে। আরিয়ান সেদিন নিথর পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল; বর্ষার বৃষ্টির চেয়েও তনিমার অসহায় চোখের জল তাকে বেশি সিক্ত করছিল। ভালোবাসার সেই করুণ আর্তনাদ সোহরাওয়ার্দীর দীর্ঘশ্বাসে মিশে গেল।

সেই বিচ্ছেদের পর কেটে গেছে দীর্ঘ পাঁচটি বছর। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছেআরিয়ানের ক্যারিয়ারের গ্রাফ এখন ঊর্ধ্বমুখী, সে এখন সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তার মনের সেই একলা স্টেশনে সময় যেন থমকে আছে সেই শেষ বিকেলেই। আজ আবারও সে নীলফামারী এক্সপ্রেসের জানালার ধারে বসে আছে। শীতের সেই একই রকম কুয়াশা, একই রকম ট্রেনের ঝকঝক শব্দ। কিন্তু পাশের সেই সিটটা আজ বড় বেশি শূন্য। তনিমা এখন সুদূর প্রবাসে অন্য কারো ঘর আলো করে আছে হয়তো, অথবা হয়তো তার তুলি এখন আর অপরাজিতার রঙ ছোঁয় না।

 

ট্রেনের গ্লাসে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে আরিয়ানের মনে পড়ে তনিমার সেই শেষ আকুতি "আরিয়ান, আমরা কি আবারও কোনো এক সাধারণ ট্রেনযাত্রায় অপরিচিত হিসেবে পরিচিত হতে পারি না? যেখানে কোনো পিছুটান থাকবে না, শুধু থাকবে অন্তহীন পথ।" আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে একটি মলিন নীল রঙের খাম বের করে। এটি তার সেই না পাঠানো চিঠি, যাতে লেখা ছিল হাজারো অপ্রকাশিত অভিমান আর না বলা ভালোবাসার কথা। ট্রেনটি যখন নীলফামারী স্টেশনে থামল, আরিয়ান বুঝলসব ট্রেনেরই একটা গন্তব্য থাকে, কিন্তু কিছু মানুষের যাত্রা কোনোদিন শেষ হয় না। তারা শুধু স্মৃতি আর না পাওয়ার দহন নিয়ে এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে ঘুরে বেড়ায়। কিছু প্রেম আসলে পূর্ণতা পাওয়ার জন্য নয়, বরং অমর অতৃপ্তি হয়ে বেঁচে থাকার জন্যই জন্ম নেয়।

ট্রেন থামে, গন্তব্য আসে। কিন্তু কিছু প্রেম কোনোদিন গন্তব্যে পৌঁছায় না; তারা রয়ে যায় নীল খামের শেষ চিঠিতে, যা কখনো পোস্ট করা হয় না।

💬

মন্তব্য

যোগাযোগ করুন

💼

সহযোগিতা ও বিজ্ঞাপন

আপনি যদি আমাদের সাথে কোলাবরেশন, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ বা কনটেন্ট পার্টনারশিপ নিয়ে কাজ করতে চান — আমাদের জানান। ব্যবসায়িক প্রস্তাব, পণ্য প্রচার, বা যেকোনো বিষয়ে যোগাযোগ করুন।

📧 ইমেইল
freesinebd@gmail.com
💬 দ্রুত উত্তর

সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর দেওয়া হয়

মেসেজ পাঠান

0/3000