ব্যাংক
চেক মামলা (যা আইনগতভাবে ‘চেক
ডিজঅনার মামলা’ নামে পরিচিত) মূলত
তখন হয়, যখন কেউ
কাউকে একটি চেক প্রদান
করে কিন্তু সেই চেকটি ব্যাংক
থেকে নগদায়ন করা সম্ভব হয়
না। বাংলাদেশে এটি The Negotiable
Instruments (NI) Act, 1881-এর
১৩৮ নম্বর ধারার অনুযায়ী দায়েরকৃত একটি ফৌজদারি মামলা
অধীনে পরিচালিত হয়, অবশ্যই ১৮০ দিনের মধ্যে
বিচার নিষ্পত্তি করতে হব।
সহজ
কথায়, আপনি কাউকে একটি
চেক দিলেন, কিন্তু তার অ্যাকাউন্টে টাকা
নেই অথবা অন্য কোনো
কারণে ব্যাংক টাকা দিতে অস্বীকৃতি
জানাল—এটাই চেক ডিজঅনার।
চেক
কেন ডিজঅনার (Dishonor) হয়?
সবচেয়ে
সাধারণ কারণগুলো হলো:
অপর্যাপ্ত
ব্যালেন্স: অ্যাকাউন্টে চেকের সমপরিমাণ টাকা না থাকা।
স্বাক্ষরের
অমিল: চেকে দেওয়া স্বাক্ষরের
সাথে ব্যাংকের রেকর্ডে থাকা স্বাক্ষরের মিল
না থাকা।
তারিখের
ভুল: চেক ইস্যু করার
তারিখ নিয়ে সমস্যা থাকা।
অ্যাকাউন্ট
বন্ধ: চেক দেওয়ার আগেই
অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেওয়া।
মামলার
প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে
চেক
ডিজঅনার মামলা করার জন্য নির্দিষ্ট
কিছু সময়সীমা মেনে চলতে হয়।
নিচে তার একটি সংক্ষিপ্ত
তালিকা দেওয়া হলো:
|
ধাপ |
করণীয় |
সময়সীমা |
|
১. চেক ডিজঅনার |
ব্যাংক থেকে 'ডিজঅনার স্লিপ' সংগ্রহ করতে
হবে। |
চেক ইস্যুর ৬
মাসের মধ্যে ব্যাংকে জমা
দিতে
হয়। |
|
২. লিগ্যাল
নোটিশ |
আইনজীবীর মাধ্যমে চেক প্রদানকারীকে টাকা
পরিশোধের জন্য
নোটিশ পাঠানো। |
ডিজঅনার হওয়ার ৩০ দিনের
মধ্যে। |
|
৩. অপেক্ষা |
নোটিশ পাওয়ার পর টাকা পরিশোধের জন্য
সময়
দিতে
হবে। |
নোটিশ পাওয়ার পর থেকে ৩০ দিন। |
|
৪. মামলা
দায়ের |
টাকা
পরিশোধ না করলে আদালতে মামলা করতে হবে। |
নোটিশের ৩০ দিন শেষ হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে। |
শাস্তির
বিধান :
আদালতে
অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তিকে
নিচের যেকোনো এক বা উভয়
দণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে:
১. সর্বোচ্চ ১ বছর বিনাশ্রম
কারাদণ্ড।
২. চেকে উল্লিখিত টাকার
তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানা।
মামলার
প্রাথমিক প্রস্তুতির জন্য আপনার যা
যা লাগবে:
মূল
চেক: যে চেকটি ডিজঅনার
হয়েছে তার অরিজিনাল কপি।
ব্যাংক
ডিজঅনার স্লিপ: ব্যাংক থেকে দেওয়া সেই
স্লিপ যেখানে ডিজঅনার হওয়ার কারণ (যেমন: Insufficient Fund) লেখা থাকে।
লিগ্যাল
নোটিশের কপি: আপনার আইনজীবী
যে নোটিশটি পাঠিয়েছেন তার এক কপি।
পোস্টাল
রিসিট: নোটিশটি রেজিস্টার্ড ডাকে পাঠানোর প্রমাণ
বা রিসিট।
মনে
রাখার মতো কিছু বিষয়:
সমঝোতা:
মামলা চলাকালীন যেকোনো পর্যায়ে উভয় পক্ষ চাইলে
আদালতের অনুমতি নিয়ে আপোষ-মীমাংসা
করতে পারে।
জামিন:
এটি একটি জামিনযোগ্য অপরাধ,
তবে বিবাদীকে আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিন নিতে
হয়।
আপিল:
যদি রায়ে সাজা হয়,
তবে সেই রায়ের বিরুদ্ধে
উচ্চ আদালতে আপিল করতে হলে
চেকে উল্লিখিত টাকার অন্তত ৫০% আদালতে জমা
দিতে হয়।
নিচে
একটি চেক ডিজঅনারের লিগ্যাল
নোটিশের সাধারণ খসড়া (Draft) দেওয়া হলো।
লিগ্যাল
নোটিশ (খসড়া)
প্রেরক:
(আপনার নাম ও পূর্ণ
ঠিকানা)
প্রাপক:
(যিনি চেক দিয়েছেন তার
নাম ও পূর্ণ ঠিকানা)
বিষয়:
১৮৮১ সালের দ্য নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস
অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অধীনে
টাকা পরিশোধের দাবি ও আইনি
নোটিশ।
জনাব,
আমার
মক্কেল (আপনার নাম)-এর পক্ষ
থেকে আপনাকে জানানো যাচ্ছে যে:
১. আপনি আপনার পাওনা
টাকা পরিশোধের জন্য আমাকে (চেক
নম্বর) এবং তারিখ: (চেকের
তারিখ) একটি চেক প্রদান
করেছিলেন। চেকের টাকার পরিমাণ (টাকার অংক কথায় ও
অংকে)।
২. আমি উক্ত চেকটি
(ব্যাংকের নাম ও শাখা)-তে গত (চেক
জমা দেওয়ার তারিখ) তারিখে নগদায়নের জন্য জমা দিলে
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা ফেরত দেয়।
ফেরতের কারণ হিসেবে ব্যাংক
স্লিপে "অপর্যাপ্ত তহবিল" (Insufficient
Funds) উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. পরবর্তীতে আমি আপনার সাথে
যোগাযোগ করলেও আপনি টাকা পরিশোধের
কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
দাবি:
এই নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ (ত্রিশ) দিনের
মধ্যে চেকের উল্লিখিত (টাকার পরিমাণ) টাকা আমার মক্কেলকে
সরাসরি বা ব্যাংকের মাধ্যমে
পরিশোধ করবেন। অন্যথায়, আপনার বিরুদ্ধে ১৮৮১ সালের দ্য
নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা মোতাবেক
আদালতে মামলা দায়ের করা হবে, যার
ফলে আপনার ১ বছর পর্যন্ত
জেল এবং চেকের টাকার
তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানা
হতে পারে।
তারিখ:
(আজকের তারিখ)
(আপনার
আইনজীবীর স্বাক্ষর ও সিল)
নোটিশ
পাঠানোর সময় যা খেয়াল
রাখবেন:
রেজিস্টার্ড
পোস্ট: নোটিশটি অবশ্যই AD (Acknowledgment
Due) সহ রেজিস্টার্ড ডাকে পাঠাবেন। এতে
প্রমাণ থাকবে যে তিনি নোটিশটি
পেয়েছেন।
সময়সীমা:
চেক ব্যাংক থেকে ফেরত আসার
৩০ দিনের মধ্যে এই নোটিশ পাঠাতে
হবে। এক দিন দেরি
হলেও মামলা গ্রহণ না হওয়ার ঝুঁকি
থাকে।
রিসিট
সংরক্ষণ: ডাকঘর থেকে দেওয়া রিসিটটি
খুব যত্ন করে রাখবেন,
এটিই মামলার প্রধান দলিল।
মন্তব্য