উন্নয়নশীল
দেশগুলোর জন্য তেলের দাম
বাড়া মানে হলো "মরার
উপর খাঁড়ার ঘা"। উন্নত বিশ্বের
তুলনায় আমাদের মতো দেশগুলোর শিল্প
খাত এই ধাক্কাটা অনেক
বেশি অনুভব করে।
উন্নয়নশীল
দেশগুলোর অধিকাংশ তেল আমদানি করে, তাই তেলের দাম বাড়লে বাইরের দেশগুলোকে বেশি টাকা
খরচ করতে হয় তেল কিনতে। এতে তাদের বাণিজ্য ঘাটতি (trade deficit) বাড়ে এবং মুদ্রার
মূল্য কমে যেতে পারে।
কেন
এই আঘাতটি এত প্রকট হয়,
তার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. উৎপাদন খরচ সরাসরি বেড়ে
যাওয়া
উন্নয়নশীল
দেশগুলোর অধিকাংশ কলকারখানা, বিশেষ করে টেক্সটাইল, সিমেন্ট
এবং ইস্পাত শিল্পে প্রচুর জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রয়োজন
হয়। তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুতের
দাম বাড়ে, ফলে সরাসরি পণ্যের
উৎপাদন খরচ (Production Cost) বেড়ে যায়। এতে
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন
হয়ে পড়ে।
২. লজিস্টিকস ও পরিবহন সংকট
কাঁচামাল
কারখানায় আনা এবং তৈরি
পণ্য বন্দরে বা বাজারে পৌঁছে
দেওয়ার জন্য পরিবহন ব্যবস্থার
ওপর নির্ভর করতে হয়। ডিজেলের
দাম বাড়লে ট্রাক ও লরি ভাড়া
বেড়ে যায়, যা পরোক্ষভাবে
প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।
৩. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান
আমাদের
মতো দেশগুলো তেলের জন্য আমদানির ওপর
নির্ভরশীল। তেলের উচ্চমূল্য মেটাতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে
ডলার খরচ করতে হয়।
এর ফলে রিজার্ভ কমে
যায় এবং অন্যান্য শিল্প
কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের
সংকট তৈরি হয়।
৪. মুদ্রাস্ফীতি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা
হ্রাস
তেলের মূল্যবৃদ্ধি
ঘটলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একটি দ্বিমুখী সংকটে পড়ে। একদিকে
ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সুদের হার বাড়াতে হয়, অন্যদিকে সুদের
হার বাড়ালে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ হ্রাস পায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে যায়
। আইএমএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক তেল বাজারে 10% মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে ঘরোয়া মুদ্রাস্ফীতি
গড়ে প্রায় 0.4 শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায় । এই প্রভাবটি উন্নত দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন
আয়ের দেশে বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় কারণ সেখানে উৎপাদন ব্যবস্থায় তেলের বিকল্প জ্বালানির
অভাব রয়েছে
তেলের
দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়।
ফলে মানুষের হাতে খরচ করার
মতো বাড়তি টাকা থাকে না।
যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তখন
দেশীয় শিল্পের তৈরি পণ্যের চাহিদাও
বাজারে কমে যায়।
২০২৬
সালের প্রেক্ষাপটে একটি বিশেষ দিক
বর্তমানে
(২০২৬ সালে) আমরা দেখছি যে,
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার
কারণে দাম যেকোনো সময়
ওঠানামা করছে। মজার ব্যাপার হলো,
আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য
তেলের দাম বাড়লে প্রবাসীদের
আয় (রেমিট্যান্স) সাময়িকভাবে বাড়লেও শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি সেই লাভকে ছাপিয়ে
যায়।
সংক্ষেপে:
উন্নত দেশগুলো তেলের বিকল্প হিসেবে দ্রুত 'রিনিউয়েবল এনার্জি' বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির
দিকে ঝুঁকে পড়ছে, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির
ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতাই শিল্প
খাতকে নাজুক করে রাখে।
মন্তব্য