বিশ্ববিদ্যালয়ের
করিডোরে অরণ্য আর নীলার পরিচয়।
অরণ্য ছিল সাধারণ ঘরের
ছেলে, কিন্তু তার চোখে ছিল
এক আকাশ স্বপ্ন। আর
নীলা? নীলা ছিল চঞ্চল,
প্রাণবন্ত। তাদের প্রেমটা ছিল চায়ের কাপে
ওঠা তুফান আর বৃষ্টিভেজা বিকেলের
মতো স্নিগ্ধ। অরণ্য বলত, "নীলা, একদিন আমাদের সব হবে। শুধু
একটু সময় দাও।" নীলা
হাসত, সেই হাসিতে ছিল
অগাধ বিশ্বাস। তারা দুজনে মিলে
হাজারো রঙিন স্বপ্ন বুনত।
বিশ্ববিদ্যালয়
শেষ হতেই আকাশ কালো
করে মেঘ জমল। অরণ্য
বেকার, টিউশনি করে কোনোমতে দিন
কাটায়। এদিকে নীলার বাড়িতে শুরু হয়েছে বিয়ের
চাপ। পাত্র প্রতিষ্ঠিত, সরকারি চাকুরিজীবী। নীলা কান্নাকাটি করে
অরণ্যকে বলল, "কিছু একটা করো
অরণ্য, বাবা আর বেশিদিন
সময় দেবেন না।"
অরণ্য
দমে যায়নি। সে জেদ ধরল,
তাকে সরকারি চাকরি পেতেই হবে। শুরু হলো
তার দিন-রাত এক
করা পড়াশোনা। নীলা তাকে সাহস
জোগাত, নিজের গয়না বিক্রি করে
অরণ্যের ফর্ম ফিলাপের টাকা
জোগাড় করে দিত। অভাবের
সংসারে তাদের প্রেমটা তখন টিকে ছিল
শুধু নীলার একতরফা ত্যাগের ওপর।
দীর্ঘ
তিন বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির পর একদিন অরণ্যের
স্বপ্ন সত্যি হলো। সে একটা
বড় সরকারি পদে যোগ দিল।
নীলা আনন্দে কেঁদে ফেলল, ভাবল এবার হয়তো
তাদের কষ্টের দিন শেষ। কিন্তু
বিধাতা হয়তো অন্য কিছু
লিখে রেখেছিলেন।
চাকরি
পাওয়ার পর অরণ্যের জগৎটা
রাতারাতি বদলে গেল। এখন
তার আশেপাশে দামী গাড়ি, দামী
রেস্তোরাঁ আর অভিজাত মানুষের
আনাগোনা। নীলার পুরনো সুতির শাড়ি বা তার
সাধারণ কথাগুলো এখন অরণ্যের কাছে
'ক্ষ্যাত' মনে হতে লাগল।
ফোনের ওপাশে অরণ্যের কণ্ঠস্বর দিন দিন ভারী
হতে শুরু করল।
শেষ
অঙ্ক
একদিন
নীলা মরিয়া হয়ে ফোন করল,
"অরণ্য, বাবা কাল আমার
বিয়ে ঠিক করে ফেলবে।
তুমি কবে আসবে বাড়িতে
কথা বলতে?"
ওপাশ
থেকে এক নিস্পৃহ কণ্ঠ
ভেসে এল, "নীলা, আসলে আমাদের স্ট্যাটাস
এখন আলাদা। মা চাচ্ছেন কোনো
এক কলিগের মেয়ের সাথে আমার বিয়ে
দিতে। আসলে আবেগ দিয়ে
তো আর সংসার চলে
না, প্র্যাকটিক্যাল হতে শেখো।"
নীলা
স্তব্ধ হয়ে গেল। যে
ছেলেটার সাফল্যের জন্য সে নিজের
বর্তমান বিলিয়ে দিয়েছিল, সেই ছেলেটা আজ
তাকে 'স্ট্যাটাস'-এর দোহাই দিয়ে
সরিয়ে দিল। অরণ্য ভুলে
গেল সেই বৃষ্টির বিকেল,
সেই অভাবের দিনগুলো, আর নীলার সেই
ত্যাগ।
উপসংহার:
অরণ্য
আজ সমাজে সফল, তার গায়ে
দামী স্যুট। কিন্তু নীলার চোখের জলে ভেজা সেই
বিশ্বাসের ঋন সে কোনোদিন
শোধ করতে পারবে না।
কিছু মানুষ উপরে ওঠার সিঁড়ি
হিসেবে অন্যের আবেগকে ব্যবহার করে, আর উপরে
উঠে সেই সিঁড়িটাই লাথি
মেরে ফেলে দেয়।
মন্তব্য