মুদ্রাস্ফীতি
হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে
পণ্য ও সেবার দামের
ধারাবাহিক বা সাধারণ বৃদ্ধি,
যার ফলে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা
কমে যায় । সহজ কথায়, আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করেও একই পরিমাণ পণ্য কেনা না যাওয়া বা পণ্য কম পাওয়াকে মুদ্রাস্ফীতি বলে । এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ, চাহিদার তুলনায় যোগান কম থাকা বা উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি
।
বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
সাম্প্রতিক উপাত্তগুলো সমন্বয় করে আমি বোঝার
চেষ্টা করছি যে মুদ্রাস্ফীতির
হার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে কতটা প্রভাবিত করছে।
ক্রয়ক্ষমতার সংকট
ও
জীবনযাত্রার
মানের
অবনতি
চাল, ডাল, ভোজ্যতেল
এবং চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের
বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে গত বছরের
মূল্যের একটি যোগসূত্র স্থাপনের
চেষ্টা করছি। সাধারণ মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার (৮.০৬%)
মুদ্রাস্ফীতির হারের (৯.১৩%) তুলনায়
অনেক কম। এর ফলে
মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে
এবং ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে। দেশের
প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ
খাদ্যমূল্যের সামান্য বৃদ্ধিতেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো
বাধ্য হয়ে তাদের জীবনযাত্রার
মান কমিয়ে দিচ্ছে এবং পুষ্টি ও
স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক চাহিদাগুলোতে
কাটছাঁট করছে। বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থানীয় মুদ্রার
অবমূল্যায়ন এই সংকটকে আরও
ঘনীভূত করছে ।
মুদ্রাস্ফীতির
এই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানকে অর্থনীতিবিদরা "স্টিকি ইনফ্লেশন" বা আঠালো মুদ্রাস্ফীতি
হিসেবে অভিহিত করছেন। এর অর্থ হলো,
বাজারে একবার দাম বেড়ে গেলে
তা সহজে নামতে চায়
না, এমনকি যদি বৈশ্বিক বাজারে
কাঁচামালের দাম কমেও যায়।
এর পেছনে মূলত কাঠামোগত দুর্বলতা,
বাজারের অলিগোপলিস্টিক প্রকৃতি বা গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর
নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চ পরিবহন
খরচ দায়ী ।
বাংলাদেশের
মুদ্রাস্ফীতি কেবল অভ্যন্তরীণ চাহিদার
কারণে নয়, বরং বৈশ্বিক
অস্থিরতা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ বাজার
ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার একটি জটিল মিশ্রণ।
মুদ্রাস্ফীতির ফলে জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার অর্থ কেবল পণ্য কম কেনা নয়, বরং এটি একটি পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানে।
বাংলাদেশের
অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা
(Resilience) অনেক বেশি। সঠিক নীতি এবং
সাহসের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
করা গেলে ২০২৬ সালের
পরবর্তী সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে
নামিয়ে আনা এবং মানুষের
জীবনযাত্রার মান পুনরায় উন্নত
করা সম্ভব হবে বলে আশা
করা যায় । তবে
এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক
অঙ্গীকার এবং স্বচ্ছ বাজার
ব্যবস্থাপনা। মুদ্রাস্ফীতির এই সংকটকাল শিক্ষা
দেয় যে, সামষ্টিক অর্থনীতি
কেবল গাণিতিক হিসাব নয়, বরং এটি
কোটি মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্নের
সাথে জড়িত।
মন্তব্য