Friday, February 6, 2026

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু স্থিতিশীলতায় সৌরশক্তির রূপান্তরমূলক প্রভাব: একটি বিশদ কৌশলগত বিশ্লেষণ


 

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু স্থিতিশীলতায় সৌরশক্তির রূপান্তরমূলক প্রভাব: একটি বিশদ কৌশলগত বিশ্লেষণ

১. ভূমিকা: আধুনিক বিশ্বের জ্বালানি সংকট ও নবায়নযোগ্য শক্তির অপরিহার্যতা

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব আজ এক অভূতপূর্ব জ্বালানি সংকটের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। গত দুই শতাব্দী ধরে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি—কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস—বর্তমানে তার সীমায় পৌঁছেছে । ভূ-গর্ভস্থ এই সম্পদের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসা কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সৌরশক্তি একটি নির্ভরযোগ্য, টেকসই এবং সাশ্রয়ী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বর্তমান তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২-২৩ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে সৌরবিদ্যুতের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২৬%, যা অন্য যে কোনো জ্বালানি উৎসের তুলনায় বেশি

জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পরিবেশগত প্রভাব বর্তমানে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত। কয়লা ও তেলের দহন বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও চরম আবহাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) এবং আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (IRENA) এর সর্বশেষ প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ সৌরশক্তি থেকে আসবে । এই রূপান্তর কেবল কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের জন্য নয়, বরং টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করার জন্যও অপরিহার্য

২. জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা ও পরিবেশগত বিপর্যয়

ঐতিহ্যবাহী শক্তি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি, কিন্তু এর উচ্চ নিঃসরণ হার এবং দ্রুত নিঃশেষিত হওয়ার প্রবণতা একে আধুনিক বিশ্বের জন্য অনুপযুক্ত করে তুলেছে। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ০.৮ থেকে ১.২ কেজি কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) নির্গত করে । বিপরীতে, সৌরশক্তির জীবনচক্র নিঃসরণ অত্যন্ত কম, সাধারণত ০.০৩ থেকে ০.০৬ কেজি CO2e/kWh

নিচে জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তির কার্বন নিঃসরণের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

জ্বালানি উৎসনিঃসরণ গুণক (kg CO2e/kWh)নিঃসরণ প্রকৃতি
কয়লা (Coal)০.৮ - ১.২অত্যধিক উচ্চ
প্রাকৃতিক গ্যাস (Natural Gas)০.৪ - ০.৬মাঝারি
পারমাণবিক (Nuclear)০.০৬৬ (Mean)নিম্ন
সৌর পিভি (Solar PV)০.০৩ - ০.০৬অত্যন্ত নিম্ন
বায়ুশক্তি (Wind)০.০১ - ০.০৩৫সর্বনিম্ন

এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং প্যারিস চুক্তির ১.৫°C লক্ষ্য বজায় রাখতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা বাধ্যতামূলক । ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ খাতের নির্গমন সর্বকালের শীর্ষে পৌঁছেছে (১৪.৬ বিলিয়ন টন), যার মূল কারণ ছিল বিদ্যুৎ চাহিদার ৪% বৃদ্ধি । তবে সৌরশক্তির ব্যাপক প্রসার না ঘটলে এই নির্গমন আরও ভয়াবহ হতে পারত।

৩. বৈশ্বিক সৌরশক্তি বাজারের বর্তমান চিত্র ও প্রবৃদ্ধির প্রবণতা (২০২৪-২০২৫)

২০২৪ এবং ২০২৫ সাল সৌরশক্তির ইতিহাসে একটি রেকর্ড সৃষ্টিকারী সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। IRENA-এর ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে রেকর্ড ৫৮৫ গিগাওয়াট (GW) নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে সৌরশক্তি একাই ৭৫% বা ৪৫২ গিগাওয়াট অবদান রেখেছে । এই ব্যাপক প্রবৃদ্ধির ফলে ২০২৪ সালের শেষে বৈশ্বিক মোট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৪,৪৪৮ গিগাওয়াট

৩.১ প্রযুক্তিগত বন্টন ও উৎপাদন সক্ষমতা

সৌরশক্তির এই অগ্রযাত্রার মূলে রয়েছে ফটোভোলটাইক (PV) প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার। ২০২৪ সালে সৌরবিদ্যুতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩২.২%, যা যেকোনো নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির মধ্যে সর্বোচ্চ । ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে বৈশ্বিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩১% বৃদ্ধি পেয়ে ২,১১০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় (TWh) পৌঁছেছে

নিচে ২০২৪ সালের নবায়নযোগ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সারণী দেওয়া হলো:

প্রযুক্তিমোট সক্ষমতা (GW)২০২৪ সালে সংযোজন (GW)প্রবৃদ্ধির হার (%)
সৌর (Solar PV)১,৮৬৫৪৫১.৯৩২.২%
জলবিদ্যুৎ (Hydropower)১,২৮৩১৫.০১.২%
বায়ুশক্তি (Wind)১,১৩৩১১৩.০১১.১%
বায়ো-এনার্জি (Bioenergy)১৫১৪.৬৩.২%
ভূ-তাপীয় (Geothermal)১৫০.৪২.৫%

এই ডেটা নির্দেশ করে যে, সৌর ও বায়ুশক্তি বর্তমানে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ খাতের রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি, যারা যৌথভাবে ২০২৪ সালের নতুন সক্ষমতার ৯৬.৬% দখল করেছে

৪. ২০৩০ সালের পূর্বাভাস: ট্রিপলিং লক্ষ্যমাত্রা ও চ্যালেঞ্জ

COP28 জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা তিনগুণ বাড়িয়ে ১১.২ টেরাওয়াট (TW) করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন । এই লক্ষ্য অর্জনে সৌরশক্তির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। IEA-এর ২০২৪ সালের 'রিনিউয়েবলস' প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির ৮০% আসবে সৌর পিভি থেকে

৪.১ ২০৩০ অভিমুখে প্রধান মাইলফলকসমূহ

২০৩০ সালের মধ্যে শক্তি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে:

  • ২০২৪: সৌর ও বায়ু সম্মিলিতভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যাবে

  • ২০২৫: নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকে ছাড়িয়ে যাবে

  • ২০২৭: সৌর পিভি বিদ্যুৎ উৎপাদন বায়ুশক্তিকে ছাড়িয়ে যাবে

  • ২০২৯: সৌর পিভি বৃহত্তম একক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে জলবিদ্যুৎকে ছাড়িয়ে যাবে

  • ২০৩০: বিশ্বে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের ৪৬% আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে, যেখানে সৌর ও বায়ু যৌথভাবে ৩০% অবদান রাখবে

তবে এই লক্ষ্য অর্জনে প্রতি বছর সক্ষমতা বৃদ্ধির হার ১৬.৬% হতে হবে, যা বর্তমানে ১৫.১% এর কাছাকাছি রয়েছে । বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো এবং গ্রিড অবকাঠামোর আধুনিকায়ন না করলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে

৫. সৌরশক্তির অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি: খরচ হ্রাস ও বিনিয়োগের গতিধারা

সৌরশক্তি বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে স্বীকৃত। এর মূলে রয়েছে সৌর মডিউলের দামের নাটকীয় পতন। ২০২৪-২৫ সালে সৌর মডিউলের দাম প্রায় ৩৫% কমে প্রতি ওয়াটে ৯ সেন্টের নিচে নেমে এসেছে । এই মূল্যহ্রাস সৌরশক্তিকে কয়লা বা প্রাকৃতিক গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে

৫.১ বিনিয়োগের বৈশ্বিক প্রবাহ

২০২৫ সালে বৈশ্বিক শক্তি রূপান্তর বিনিয়োগ রেকর্ড ২.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮% বেশি । নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে ৬৯০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যার একটি বিশাল অংশই গিয়েছে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে । বিশেষ করে ছোট আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে (Small-scale solar) বিনিয়োগ অভাবনীয় হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক সৌর বিনিয়োগ ছিল ২৫২ বিলিয়ন ডলার, যা বায়ুশক্তির (১২৬ বিলিয়ন ডলার) দ্বিগুণ

নিচে প্রধান অঞ্চলগুলোর বিনিয়োগ প্রবণতা দেখানো হলো:

অঞ্চল২০২৫ বিনিয়োগ (বিলিয়ন USD)প্রবৃদ্ধির হার (%)প্রধান ফোকাস
চীন৮০০- (সামান্য হ্রাস)সোলার ও ব্যাটারি উৎপাদন
ইউরোপীয় ইউনিয়ন৪৫৫১৮%গ্রিন ডিল ও ডিকার্বনাইজেশন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৩৭৮৩.৫%IRA ট্যাক্স ক্রেডিট
ভারত৬৮১৫%ইউটিলিটি স্কেল সোলার ও পিএলআই

এই বিনিয়োগের ধারা কেবল বড় অর্থনৈতিক দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। উদীয়মান বাজারগুলোতেও (Emerging Markets) সৌরশক্তি খাতের বিনিয়োগ ২০১৫ সালের ৪৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে

৬. প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: PERC থেকে TOPCon এবং HJT-এর রূপান্তর

সৌরশক্তির দক্ষতার মূলে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির উদ্ভাবন। গত কয়েক বছর ধরে পি-টাইপ PERC প্রযুক্তি বাজারে আধিপত্য বিস্তার করলেও, এখন এন-টাইপ (N-type) প্রযুক্তির দিকে দ্রুত রূপান্তর ঘটছে । এর কারণ হলো PERC প্রযুক্তি তার তাত্ত্বিক দক্ষতার সীমায় (প্রায় ২৪%) পৌঁছে গেছে।

৬.১ TOPCon এবং HJT প্রযুক্তির তুলনা

বর্তমানে বাজারের প্রধান দুটি উচ্চ-দক্ষ প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্য নিচে দেওয়া হলো:

বৈশিষ্ট্যTOPCon (N-type)HJT (Heterojunction)
বাণিজ্যিক দক্ষতা (%)২৫.০ - ২৬.০২৫.৫ - ২৬.৫
তাপমাত্রা গুণক-০.৩০%/°C-০.২৪%/°C
বাইফেসিয়ালিটি ফ্যাক্টর৮০% - ৮৫%৯০% - ৯৫%
উৎপাদন খরচমাঝারি (PERC লাইনে আপগ্রেডযোগ্য)উচ্চ (নতুন সরঞ্জাম প্রয়োজন)
আয়ুষ্কাল গ্যারান্টি২৫ - ৩০ বছর৩০ - ৩৫ বছর

TOPCon প্রযুক্তি বর্তমানে ২০২৪-২৫ সালে মূলধারায় পরিণত হয়েছে এবং এর বাজার শেয়ার ৭০% এর বেশি । অন্যদিকে HJT প্রযুক্তি চরম আবহাওয়া এবং উচ্চ তাপমাত্রায় (যেমন সৌদি আরব বা অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে) অনেক বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে

৬.২ পেরোভস্কাইট ও ট্যান্ডেম সেলের ভবিষ্যৎ

গবেষণাগারে পেরোভস্কাইট-অন-সিলিকন ট্যান্ডেম সেলের দক্ষতা ইতিমধ্যে ৩৪.৮৫% ছাড়িয়ে গেছে । এই প্রযুক্তিতে সিলিকন স্তরের ওপর পেরোভস্কাইটের একটি পাতলা স্তর যুক্ত করা হয়, যা সূর্যের আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করতে পারে। যদিও এটি এখনো বাণিজ্যিকীকরণের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে এটি সৌরশক্তির পরবর্তী বড় বিপ্লব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে

৭. কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও জলবায়ু স্থিতিশীলতায় অবদান

সৌরশক্তি ব্যবহারের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো এর কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) নিঃসরণ কমানোর ক্ষমতা। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১ টন পর্যন্ত CO2 নির্গত করতে পারে, যেখানে সৌর পিভি সিস্টেমের জীবনচক্র নির্গমন অত্যন্ত নগণ্য

৭.১ জীবনচক্র বিশ্লেষণ (LCA) এর মাধ্যমে নিঃসরণ গণনা

সৌর প্যানেল ব্যবহারের নিঃসরণ মূলত এর উৎপাদন, পরিবহন এবং স্থাপনের সময় ঘটে। একবার চালু হয়ে গেলে এটি আর কোনো নিঃসরণ ঘটায় না। একটি ১ কিলোওয়াট পিক (kWp) ক্ষমতার সৌর মডিউল তার সম্পূর্ণ জীবনচক্রে (৩০ বছর) প্রায় ১,৬০১ কেজি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করে, যা কয়লার তুলনায় প্রায় ৭০ গুণ কম

নিচে বিভিন্ন প্রযুক্তির জীবনচক্র নিঃসরণ (Life-cycle emissions) দেখানো হলো:

$$Emissions_{LCA} = \frac{\sum (Materials + Manufacturing + Transport + Disposal)}{Lifetime\ Generation}$$
মডিউল প্রযুক্তিনিঃসরণ (g CO2 eq/kWh)দক্ষতা (%)
Mono-Si৪২.৯২০.০
Multi-Si৪৪.০১৮.০
CIS (Thin Film)৩৫.৪১৭.০
CdTe (Thin Film)২৫.৫১৮.২

সৌরশক্তি সম্প্রসারণের ফলে ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ২.৬ বিলিয়ন টন অতিরিক্ত CO2 নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হয়েছে । এটি প্রমাণ করে যে, টেকসই পৃথিবী গড়তে সৌরশক্তির কোনো বিকল্প নেই।

৮. আঞ্চলিক বিশ্লেষণ: চীন, ভারত এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

সৌরশক্তি গ্রহণে আঞ্চলিক বৈষম্য থাকলেও কিছু দেশ এক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করছে। চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম সৌরশক্তি বাজার এবং উৎপাদক। ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট সক্ষমতা বৃদ্ধির ৬০% এরও বেশি এসেছে চীন থেকে 。 চীন ইতিমধ্যে তার ২০৩০ সালের জন্য নির্ধারিত ১,২০০ গিগাওয়াট লক্ষ্যমাত্রা ছয় বছর আগেই অতিক্রম করার পথে রয়েছে

৮.১ ভারত: উদীয়মান সৌর পরাশক্তি

ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নবায়নযোগ্য বৃদ্ধির বাজার। ২০২৪ সালে ভারত ২৪.৫ গিগাওয়াট সৌর সক্ষমতা যুক্ত করেছে । ভারত সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্ম জ্বালানি সক্ষমতা অর্জন করা। ভারতের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের (Rooftop PV) নতুন সহায়তা স্কিম এবং প্রতিযোগিতামূলক নিলাম পদ্ধতি এই প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে

৮.২ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল

এশিয়া মহাদেশ ২০২৪ সালে নতুন সক্ষমতার ৭২% শতাংশ সরবরাহ করেছে । বিশেষ করে পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে সস্তা চীনা সৌর প্যানেলের আমদানির ফলে বিদ্যুৎ সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে । পাকিস্তানে ২০২৪ সালেই বিশ্বের মোট সৌর সক্ষমতা বৃদ্ধির ১১% ঘটেছে, যা দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করছে

৯. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ ও বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশ তার জ্বালানি মিশ্রণে সৌরশক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে নতুন গতি লাভ করেছে। দীর্ঘ সময়ের ধীরগতির পর, সরকার 'নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫' (Renewable Energy Policy 2025) অনুমোদন করেছে, যার লক্ষ্য হলো জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশ রক্ষা করা

৯.১ নীতিমালার লক্ষ্যমাত্রা ও উদ্দেশ্যসমূহ

২০২৫ সালের নতুন নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:

  • ২০৩০ সালের মধ্যে: মোট বিদ্যুতের ২০% (প্রায় ৬,১৪৫ মেগাওয়াট) নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করা

  • ২০৪০ সালের মধ্যে: নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৩০% (প্রায় ১৭,৪৭০ মেগাওয়াট) এ উন্নীত করা

  • ২০৫০ সালের মধ্যে: একটি উচ্চ প্রবৃদ্ধি সিনারিওতে ৫০% নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন

  • ছাদভিত্তিক সৌরশক্তি: ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩,০০০ মেগাওয়াট নতুন ছাদভিত্তিক সোলার সক্ষমতা স্থাপনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা

নিচে বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর পরিকল্পনার (EPSMP 2025) প্রস্তাবিত জ্বালানি মিশ্রণ দেখানো হলো:

জ্বালানি উৎস২০২৫ শেয়ার (%)২০৩০ লক্ষ্য (%)২০৫০ লক্ষ্য (High Case)
গ্যাস ও এলএনজি৪৫%-২৯%
কয়লা২০%-১২.৯ GW (Cap)
তেল (Fuel Oil)১৭%-১%
সৌরশক্তি৫.২% (RE total)২০%৩২.১ GW
বায়ুশক্তি<১%-১১% (৯.৬ GW)

৯.২ নেট মিটারিং সংশোধন ও চ্যালেঞ্জসমূহ

বাংলাদেশের সৌরশক্তির প্রসারে নেট মিটারিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সরকার নেট মিটারিং নির্দেশিকা সংশোধন করেছে। নতুন নিয়মে:

  • অনুমোদিত লোডের ১০০% পর্যন্ত সোলার স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে (আগে যা ছিল ৭০%)

  • একক ফেজ (Single-phase) গ্রাহকদেরও নেট মিটারিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে

  • স্মার্ট এবং প্রিপেইড মিটার গ্রাহকরাও এখন এই সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন

তবে উচ্চ আমদানি শুল্ক (২৮.৭৩%) এখনো সৌর সরঞ্জামের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা শিল্প মালিকদের নিরুৎসাহিত করছে । স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ৫০০-৭০০ মেগাওয়াট, যা ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নয়

১০. গ্রিড ইন্টিগ্রেশন এবং এনার্জি স্টোরেজ: একটি অপরিহার্য সমন্বয়

সৌরশক্তির একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এর পরিবর্তনশীলতা—সূর্য কেবল দিনের বেলা থাকে। তাই গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS) এবং উন্নত গ্রিড ম্যানেজমেন্ট অপরিহার্য হয়ে পড়েছে

১০.১ ব্যাটারি স্টোরেজের উত্থান

২০২৪ সালে গ্রিড স্টোরেজ স্থাপনের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ ৩৭.৪ গিগাওয়াট স্টোরেজ সক্ষমতা চালু হয়েছে, যার অধিকাংশই সৌর প্রকল্পের সাথে যুক্ত । বর্তমানে লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (LFP) ব্যাটারিগুলো নিকেল ম্যাঙ্গানিজ কোবাল্ট (NMC) ব্যাটারির স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে কারণ এগুলোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা বেশি

১০.২ ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট (VPP)

ভবিষ্যতের গ্রিড ম্যানেজমেন্টে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট একটি বৈপ্লবিক ধারণা। এটি শত শত ছোট ছোট সৌর ইউনিট এবং ব্যাটারিকে একত্রিত করে একটি একক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো কাজ করায়। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ গিগাওয়াট সক্ষমতার ডিইআর (Distributed Energy Resources) ভি PPG-এর আওতায় এসেছে । এটি গ্রিডের স্থিতিশীলতা বাড়াতে এবং অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতে সাহায্য করে।

১১. সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব: কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়ন

সৌরশক্তি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না, এটি লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করছে। সৌরশক্তি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি অন্যান্য জ্বালানি খাতের তুলনায় দ্রুততর । এটি গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে 'এনার্জি প্রোডাক্টিভিটি' বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে অফ-গ্রিড সৌরশক্তি (Off-grid solar) বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ১.৭ গিগাওয়াট সক্ষমতা বাড়িয়েছে, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে

সৌরশক্তি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে সরাসরি ভূমিকা রাখে:

  • SDG 7: সবার জন্য সাশ্রয়ী ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিতকরণ।

  • SDG 8: শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

  • SDG 13: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা

১২. উপসংহার: সৌরশক্তির ভবিষ্যৎ ও করণীয়

উপরে বর্ণিত তথ্য ও বিশ্লেষণ থেকে এটি পরিষ্কার যে, সৌরশক্তি বর্তমানে কোনো ভবিষ্যৎ কল্পনা নয়, বরং এটি বর্তমান বিশ্বের জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের রেকর্ড ব্রেকিং সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মডিউলের দামের নাটকীয় পতন সৌরশক্তিকে জ্বালানি জগতের প্রধান শক্তিতে পরিণত করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসার সম্ভাবনা এখন দৃঢ়

তবে এই রূপান্তরকে সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে বৈশ্বিক মনোযোগ প্রয়োজন: ১. গ্রিড আধুনিকায়ন: পরিবর্তনশীল সৌরবিদ্যুৎ সামাল দিতে গ্রিড অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন । ২. সাপ্লাই চেইন বৈচিত্র্যকরণ: বর্তমানে সৌর মডিউল উৎপাদনের ৮০% এর বেশি চীনের নিয়ন্ত্রণে, যা সরবরাহ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হতে পারে। ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে । ৩. অর্থায়ন: নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সৌর প্রকল্পের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, কারণ বর্তমানে উদীয়মান বাজারের ১% এরও কম বিনিয়োগ এই দেশগুলোতে পৌঁছায়

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সৌরশক্তি কেবল একটি পরিবেশগত পছন্দ নয়, বরং এটি জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জনের চাবিকাঠি। ২০২৫ সালের নতুন নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন এবং শুল্ক বাধা অপসারণ করা গেলে বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সৌর বিপ্লবের সুফল ভোগ করতে পারবে। পরিশেষে, জীবাশ্ম জ্বালানির যুগ শেষ হয়ে আসছে এবং সৌরশক্তির হাত ধরেই মানবজাতি একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও টেকসই পৃথিবীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

0 Comments:

Post a Comment

"আমাদের সাথে শেয়ার করুন আপনার চিন্তাভাবনা..."