Monday, February 9, 2026

বাংলাদেশে বিবাহ এবং তালাক সংক্রান্ত আইনগুলো মূলত ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধান আইনগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

 


. মুসলিম বিবাহ তালাক আইন

মুসলিমদের ক্ষেত্রে বিবাহ এবং তালাক মূলত শরিয়াহ এবং রাষ্ট্রীয় আইনের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। 

  • প্রধান আইনসমূহ: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং মুসলিম বিবাহ তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ [.., ..]
  • বিবাহের বয়স: পুরুষের জন্য সর্বনিম্ন ২১ বছর এবং নারীর জন্য ১৮ বছর [..]
  • নিবন্ধন: প্রতিটি বিবাহ এবং তালাক সরকারিভাবে নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর মাধ্যমে সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক [..] ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে বিবাহ তালাক নিবন্ধনের সরকারি ফি সংশোধিত (বৃদ্ধি) করা হয়েছে [..]
  • তালাকের নিয়ম: স্বামী বা স্ত্রী (যদি কাবিননামায় অধিকার থাকে) তালাক দিলে তা ৯০ দিন পর কার্যকর হয় [..] এই সময়ের মধ্যে একটি সালিশি পরিষদ (Arbitration Council) গঠনের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করা হয় [.., ..] 

. হিন্দু বিবাহ আইন

হিন্দুদের ক্ষেত্রে বিবাহ একটি ধর্মীয় সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়। 

. খ্রিস্টান বিবাহ তালাক আইন

খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিবাহ এবং বিচ্ছেদ সুনির্দিষ্ট প্রাচীন আইনের অধীনে পরিচালিত হয়।

  • বিবাহ: খ্রিস্টান ম্যারেজ অ্যাক্ট, ১৮৭২ অনুযায়ী গির্জায় বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হয় [.., ..]
  • তালাক: তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ আদালত নির্ভর এবং এটি বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৮৬৯ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত [.., ..] 

. বিশেষ বিবাহ আইন (Special Marriage Act)

ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে বিবাহ বা ধর্মীয় রীতিনীতি ছাড়া সিভিল ম্যারেজের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২ কার্যকর হয় [.., ..] এই আইনের অধীনে বিচ্ছেদ চাইলে তা ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯ অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হয় [..] 

 

 

বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাকের পর দেনমোহর এবং খোরপোষ (ভরণপোষণ) আদায় করা নারীর আইনি অধিকার। ২০২৬ সালের বর্তমান আইন বিধিমালা অনুযায়ী এর বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:

. দেনমোহর (Mahr)

দেনমোহর হলো বিবাহের একটি অত্যাবশ্যকীয় ঋণ যা স্বামীকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হয়। 

  • তালাক পরবর্তী অধিকার: স্বামী তালাক দিক বা স্ত্রী নিজে (তালাক--তৌফিজের মাধ্যমে) তালাক নিকউভয় ক্ষেত্রেই স্ত্রী তার পূর্ণ দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী [.., ..] এমনকি 'খুলা' তালাকের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট চুক্তি না থাকলে দেনমোহরের অধিকার নষ্ট হয় না [..]
  • দুই প্রকার দেনমোহর:
    • মুয়াজ্জল (আশু): যা স্ত্রী চাইলেই পরিশোধ করতে হয় [..]
    • মুঅজ্জল (বিলম্বিত): যা সাধারণত তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর দাবি করা যায় [.., ..]
  • পরিশোধ না করলে: দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন [.., ..] স্বামীর মৃত্যু হলেও তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে দেনমোহর আদায় করা যায় [.., ..] 

. খোরপোষ বা ভরণপোষণ (Maintenance)

বিবাহ বিচ্ছেদের পর ভরণপোষণের আইন ধর্মভেদে কিছুটা ভিন্ন হয়:

  • মুসলিম আইন:
    • ইদ্দতকালীন খোরপোষ: তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রী সাধারণত পরবর্তী ৯০ দিন (ইদ্দতকাল) পর্যন্ত স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী [.., .., ..]
    • গর্ভবতী হলে: স্ত্রী গর্ভবতী থাকলে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত স্বামী তাকে খোরপোষ দিতে বাধ্য [..]
    • সন্তানের খোরপোষ: সন্তান মায়ের জিম্মায় থাকলে বাবা তাদের সাবালক হওয়া পর্যন্ত (ছেলেদের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৮ এবং মেয়েদের বিয়ের আগ পর্যন্ত) ভরণপোষণ প্রদান করবেন [১.১.২, ১.৫.১]।
    • হিন্দু আইন:
    • হিন্দুদের মধ্যে তালাকের আইনি বিধান না থাকায় স্ত্রী হিন্দু বিবাহিত নারীর পৃথক বসবাস রক্ষণাবেক্ষণ আইন, ১৯৪৬ এর অধীনে স্বামীর থেকে পৃথক থেকে আমৃত্যু ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন, যদি স্বামী নিষ্ঠুরতা করে বা অন্য বিয়ে করে [.., .., ..]
    • খ্রিস্টান আইন:
    • আদালতে বিচ্ছেদ মামলা চলাকালীন স্ত্রী অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোষ (Alimony) দাবি করতে পারেন, যা স্বামীর আয়ের এক-পঞ্চমাংশের বেশি হবে না [..] বিচ্ছেদের পরও আদালত স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে স্থায়ী ভরণপোষণের আদেশ দিতে পারেন [..] 
    • . মামলা করার পদ্ধতি
    • যদি স্বামী দেনমোহর বা খোরপোষ দিতে অস্বীকার করেন:
    • পারিবারিক আদালত: স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন, সেই এলাকার পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন [..]
    • প্রয়োজনীয় নথিপত্র: কাবিননামা (নিকাহনামা) এবং তালাকের নোটিশের কপি সাথে থাকতে হবে।
    • আদালতের ফি: ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, পারিবারিক আদালতের ফি এবং রেজিস্ট্রেশন ফি কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে [..] 
    • গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: কোনো পরিস্থিতিতেই দেনমোহর মাফ হয় না যদি না স্ত্রী স্বেচ্ছায় তা লিখিতভাবে মাফ করে দেন। তবে তালাক পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদী খোরপোষের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রায় দিয়েছেন, যা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। 

 

 

দেনমোহর খোরপোষ আদায়ের মামলা করার পদ্ধতি:

আদালত নির্বাচন: স্ত্রী বর্তমানে যেখানে বসবাস করছেন, সেই এলাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হবে।
প্রয়োজনীয় নথিপত্র: কাবিননামার (নিকাহনামা) সত্যায়িত কপি এবং তালাক হয়ে থাকলে তালাকের নোটিশ বা প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হবে।
মামলা দাখিল: একজন আইনজীবীর মাধ্যমে আরজি (Plaint) তৈরি করে আদালতে জমা দিতে হয়। বর্তমানে পারিবারিক আদালতের কোর্ট ফি খুব সামান্য (সাধারণত ২০০ টাকার কম)
সমন জারি: আদালত স্বামীর কাছে নোটিশ পাঠাবেন। স্বামী হাজির না হলে তার অনুপস্থিতিতেই (Ex-parte) আদালত রায় দিতে পারেন।
ডিক্রি জারি: আদালত দেনমোহরের টাকা পরিশোধের আদেশ দিলে এবং স্বামী তা না দিলে, আদালত তার সম্পত্তি ক্রোক করে বা প্রয়োজনে তাকে সিভিল কারাদণ্ড দিয়ে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করেন।

বিশেষ তথ্য:

  • তামাদি কাল: তালাক হওয়ার  বছরের মধ্যে দেনমোহর আদায়ের মামলা করতে হয়। বছর পার হয়ে গেলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
  • খোরপোষ: বর্তমানে স্ত্রী প্রতি মাসে কত টাকা খোরপোষ পাবেন, তা স্বামীর আয় এবং সামাজিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে আদালত নির্ধারণ করে দেন।

 

 

0 Comments:

Post a Comment

"আমাদের সাথে শেয়ার করুন আপনার চিন্তাভাবনা..."